বাংলাদেশের প্রধান গবাদি পশুর জাত পরিচিতি
উন্নত ও সংকর জাত (গরু)
- হলষ্টাইন ফ্রিজিয়ান (Holstein Friesian): হল্যান্ড এদের আদি বাসস্থান। এই জাতের গাভীগুলো কালো-সাদা রঙের হয় এবং এদের দেহ বেশ বড়। দেহের পিছন এবং মধ্যাংশে ভারী, ওলান বড় এবং লম্বা ও সরু মাথা থাকে। গাভীর ওজন ৬০০-৭০০ কেজি এবং ষাঁড়ের ওজন ৮০০-১০০০ কেজি হয়। এরা দৈনিক ১০-১৫ লিটার দুধ উৎপাদন করে। জন্মের সময় বাছুরের ওজন ৪৫-৫০ কেজি হয় এবং বকনা ২-২.৫ বছর বয়সে গরম হয়, মোটামুটি ১৪ মাস অন্তর বাচ্চা প্রসব করে ।
- জার্সি (Jersey): জার্সি, গুয়েনসি, এ্যালজনি ও সার্ক চ্যানেল দ্বীপসমূহ এদের আদি বাসস্থান। সুঠাম দেহের মাঝারি আকারের গরু, পিঠের শির সোজা এবং ওলান বড়। গায়ের রং হালকা লাল। গাভীর ওজন ৪০০-৫০০ কেজি এবং ষাঁড়ের ওজন ৬৫০-৮৫০ কেজি। দৈনিক ১০-১৫ লিটার দুধ দিয়ে থাকে ।
- হরিয়ানা (Hariana): এটি একটি ভারতীয় জাত। ষাঁড় ও গাভী অত্যন্ত বৃহদাকার। মূলত হাল চাষ ও গাড়ী টানার জন্য খুব উপযোগী, তবে দুধাল গাভী হিসেবেও পরিচিত। এদের দেহ খুব আটসাট এবং এরা ভীষণ পরিশ্রমী। অল্প আহারে প্রতিকূল অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে। গায়ের রং সাদা। দৈনিক গড়পড়তা ৮-১২ লিটার দুধ দিয়ে থাকে ।
- লাল সিন্ধী (Red Sindhi): পাকিস্তান এদের আদি বাসস্থান। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এদের বাসস্থান। এদের গায়ের রং লাল এবং মাঝারি আকারের গরু। ষাঁড়গুলোর দেহ বেশ নাদুস নুদুস। এই জাতের গাভী খুব দুধাল এবং এরা গড়পড়তায় ৮-১০ লিটার দুধ দেয়। গাভীর ওজন ৩৫০-৪৫০ কেজি এবং ষাঁড়ের ওজন ৪০০-৫০০ কেজি। বকনা ২-৩ বছর বয়সে বাচ্চা দেবার উপযোগী হয় এবং এরপর প্রতি বার মাস অন্তর এরা বাচ্চা দিয়ে থাকে। গাভী স্বভাবের দিক থেকে শান্ত, কিন্তু ষাঁড় ততটা শান্ত নয় ।
- শাহীওয়াল (Sahiwal): পাকিস্তান এদের আদি বাসস্থান। লাল জাতের ষাঁড় ও গাভী, এরা একটু অলস প্রকৃতির হয়। বলদ হাল চাষ ও গাড়ী টানার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই জাতের গাভীর ওজন ৪০০-৫০০ কেজি। ষাঁড় ও বলদের ওজন ৬০০-৮৫০ কেজি। দুধ দেয় গড়পড়তায় ৮-১০ কেজি ।
ছাগলের জাত
- ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট (Black Bengal Goat): বাংলাদেশের সর্বত্র দেখা যায়। এটি নাদুস নুদুস রঙের ছোট অথচ বলিষ্ঠ ছাগল। এদের গায়ের কালো লোম খুব নরম, কান খাড়া এবং দেহ খাটো। পূর্ণবয়স্ক খাসির ওজন ১৫-২০ কেজি এবং ছাগীর ওজন ১০-১৫ কেজি হয়। স্ত্রী ছাগল বছরে গড়ে ৪টি বাচ্চা দেয় এবং বছরে ২ বার বাচ্চা দেয়। এই ছাগলের মাংসের প্রতিটি পুরতে চর্বি থাকে, তাই মাংস খুব সুস্বাদু হয়। তবে, এসব ছাগলের দুধ খুব কম হয় ।
- যমুনাপারী (Jamunapari): যমুনা ও গঙ্গা নদীর অববাহিকায় এই ছাগলের আদি নিবাস। এদের আকৃতি বেশ বড় এবং দেখতে খুব সুন্দর। এদের পা লম্বা এবং গায়ের রঙ বাদামী। এই জাতের ছাগল বছরে একবার বাচ্চা দেয়। ছাগীর ওলান বেশ বড় হয় এবং এরা প্রতিদিন ৩-৪ কেজি দুধ দেয় ।
সারণি ১: বাংলাদেশের প্রধান উন্নত গরুর জাত ও বৈশিষ্ট্য
| জাতের নাম | আদি বাসস্থান | শারীরিক বৈশিষ্ট্য | গড় ওজন (গাভী/ষাঁড়) | দৈনিক দুধ উৎপাদন | প্রজনন বৈশিষ্ট্য | উপযোগিতা |
|---|---|---|---|---|---|---|
| হলষ্টাইন ফ্রিজিয়ান | হল্যান্ড | কালো-সাদা, বড় দেহ, ভারী পিছন ও মধ্যাংশ, বড় ওলান, সরু মাথা | ৬০০-৭০০ কেজি / ৮০০-১০০০ কেজি | ১০-১৫ লিটার | বাছুরের ওজন ৪৫-৫০ কেজি, বকনা ২-২.৫ বছরে গরম, ১৪ মাস অন্তর বাচ্চা | দুধ (উচ্চ) |
| জার্সি | জার্সি, গুয়েনসি, এ্যালজনি ও সার্ক চ্যানেল দ্বীপসমূহ | মাঝারি আকারের, হালকা লাল রং, সোজা পিঠ, বড় ওলান | ৪০০-৫০০ কেজি / ৬৫০-৮৫০ কেজি | ১০-১৫ লিটার | দুধ (উচ্চ) | |
| হরিয়ানা | ভারত | বৃহদাকার, সাদা রং, আটসাট দেহ, পরিশ্রমী | ৮-১২ লিটার | হালচাষ, গাড়ী টানা, দুধ | ||
| লাল সিন্ধী | পাকিস্তান (বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) | লাল রং, মাঝারি আকারের, নাদুস নুদুস ষাঁড় | ৩৫০-৪৫০ কেজি / ৪০০-৫০০ কেজি | ৮-১০ লিটার | বকনা ২-৩ বছরে বাচ্চা দেয়, ১২ মাস অন্তর বাচ্চা | দুধ, মাংস |
| শাহীওয়াল | পাকিস্তান | লাল রং, অলস প্রকৃতির | ৪০০-৫০০ কেজি / ৬০০-৮৫০ কেজি | ৮-১০ কেজি | হালচাষ, গাড়ী টানা, দুধ |
গবাদি পশু পালনের পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা
উন্নত জাতের পশুপালনের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, সুষম খাদ্য, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং যথাসময়ে রোগ দমন অপরিহার্য ।
সনাতন পালন পদ্ধতি
বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতা
এই পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এলাকা থেকে দুধাল গাভী নির্বাচন করে ভালো ষাঁড়ের সাথে মিলন ঘটিয়ে ধীরে ধীরে উন্নত জাতের ষাঁড় ও গাভী পাওয়া যায়। গাভী গরম হলেই ভালো জাতের ষাঁড় খুঁজে বের করে মিলন ঘটাতে হয় । যদিও এটি একটি সরল এবং কম খরচের পদ্ধতি, যা ছোট আকারের খামারিদের জন্য উপযোগী এবং স্থানীয় পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া পশুর জাত তৈরি করে , তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জাত উন্নয়নের গতি অত্যন্ত ধীর এবং কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যগুলো দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে পাওয়া কঠিন। এতে অনেক সময় ধরে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক নির্বাচনের প্রয়োজন হয় । এছাড়াও, বাঁধা ঘরে পশুর সহজে ঘোরাফেরার ব্যবস্থা না থাকায় ব্যায়াম হয় না এবং এতে বিভিন্ন ধরনের রোগ হবার সম্ভাবনা থাকে। একই জায়গায় দিনরাত্রি বাঁধা থাকে বলে মেঝে স্যাঁতস্যাঁতে থাকে, যা স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে ।
সনাতন পদ্ধতি যদিও কম ব্যয়বহুল এবং স্থানীয় পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়ক, তবে এর ধীরগতি এবং স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতা আধুনিক বাণিজ্যিক খামারের জন্য একটি বড় বাধা। এটি মূলত জীবিকা নির্বাহের জন্য উপযুক্ত, কিন্তু বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন বৃদ্ধিতে এর কার্যকারিতা সীমিত। একটি বাণিজ্যিক খামারের লক্ষ্য থাকে দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি এবং লাভ সর্বাধিক করা, যা সনাতন পদ্ধতির মাধ্যমে অর্জন করা কঠিন। এটি একটি ট্রেড-অফ: কম ঝুঁকি ও কম খরচ বনাম কম উৎপাদন ও কম গতি।
আধুনিক পালন পদ্ধতি
স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান নির্মাণ ও পরিচর্যা
গবাদি পশুর বাসস্থান এমন উঁচু জমিতে হওয়া প্রয়োজন, যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে না এবং বন্যার পানি প্রবেশ করতে পারে না । বাসঘর দক্ষিণামুখী বা পূর্বমুখী হওয়া উচিত, যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে । প্রতিটি ঘরের মেঝে উঁচু হবে এবং চারদিক ঢালু থাকবে যেন প্রস্রাব (চোনা) মেঝেতে জমে না থাকে। ঘরের মেঝে বাঁধাই করা ভালো, তবে মসৃণ করা চলবে না, কারণ মসৃণ মেঝেতে গরু পিছলে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে । ঘরের মেঝেতে কিছুটা খড়কুটা ব্যবহার করলে চোনা মিশ্রিত খড়কুটা এবং গোবরের মাধ্যমে চমৎকার খামারজাত সার তৈরি হয়, যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর পদ্ধতি । গবাদি পশুর ফিডিং ট্রাফ (খাবার পাত্র) সব সময় পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে যাতে রোগজীবাণু জমতে না পারে ।
আবদ্ধ ঘরে প্রতি গাভীর জন্য গড়ে ৩৫-৪০ বর্গ ফুট (৮’x৫’) জায়গার প্রয়োজন হয়। ঘরের মেঝে থেকে চালার উচ্চতা কমপক্ষে ১০ ফুট হতে হবে। টিনের চালা বিশিষ্ট ঘর হলে টিনের চালার নিচে চাটাই ব্যবহার করতে হবে, যা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। গোয়াল ঘরে খাদ্য সরবরাহের জন্য ৫ ফুট প্রশস্ত রাস্তা, খাদ্য পাত্র ও পানির পাত্রের জন্য ২ ফুট এবং নালার জন্য ১ ফুট জায়গা রাখতে হবে । আধুনিক খামারে ঘর তৈরিতে বেশি খরচ না করে শুধু উপরে একটি ছাউনি দিলেই যথেষ্ট, যাতে সরাসরি রোদ, বৃষ্টি বা ঠান্ডা গরুর উপর না পড়ে। এতে চারপাশে বাতাস চলাচল করতে পারবে এবং গরু বৃষ্টিতে ভিজলেও তেমন ক্ষতি হবে না। এর ফলে তাদের শরীর পরিষ্কার থাকে, বাতাস পরিষ্কার থাকে এবং গরুর বৃদ্ধি দ্রুত হয়। মশার সমস্যা সমাধানের জন্য ঘরের চারপাশে নেট লাগানো যেতে পারে ।
সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা
স্বয়ংক্রিয় খাওয়ানো পদ্ধতি ও ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক তৈরির কৌশল
গরুকে তিনটি পদ্ধতিতে মিশ্রিত উন্নত খাবার দেওয়া যায়: ১) আঁশ জাতীয় খড় খাদ্যের সাথে মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে, ২) দানাদার জাতীয় খাদ্যের সাথে সরাসরিভাবে এবং ৩) ইউরিয়া মোলাসেস বুকের মাধ্যমে খড়ের সাথে মিশিয়ে ।
- ইউরিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণ: প্রতি ১০০ কেজি খড়ের জন্য ১.৫-২.০০ কেজি ইউরিয়া সার ব্যবহার করে বায়ুরোধী বড় বাঁশের ডোল বা ইটের তৈরি হাউজে ৭-১০ দিন আবদ্ধ অবস্থায় রেখে দিতে হবে। তারপর ঐ খড় বের করে রৌদ্রে শুকিয়ে নিতে হবে যেন ইউরিয়া তীব্র গন্ধ কিছুটা কমে আসে। এ খড়ের সাথে শতকরা ৪০ ভাগ হারে সাধারণ শুকনা খড় মিশিয়ে খাওয়ালে অ্যামোনিয়াজনিত কোনো বিষক্রিয়া হবার সম্ভাবনা থাকে না ।
সাইলেজ তৈরি (কাঁচা ঘাস সংরক্ষণ): ১০০ কেজি কাঁচা ঘাসের জন্য ৩-৪ কেজি চিটা গুড়, চিটা গুড়ের সমপরিমাণ পানি, শুকনা খড় ও পলিথিন কভার ব্যবহার করা হয়। পানি জমে না এমন একটি উঁচু স্থানে পলিথিন দিয়ে ঢেকে তার উপর ঘাস স্তরে স্তরে সাজিয়ে চিটাগুড় ও পানির মিশ্রণ ছিটিয়ে দিতে হবে। মাঝে মাঝে ঘাসের স্তরের উপর পা দিয়ে চাপ দিতে হবে যাতে ভিতরে বাতাস না থাকতে পারে। কিছু দিন পর ঘাসের রং বিবর্ণ হলেও তা খাওয়ানোর উপযোগী থাকে ।
সারণি ২: বিভিন্ন বয়সের ও কাজের পশুর সুষম খাদ্যের তালিকা
| খাদ্যের ধরন | পূর্ণ বয়স্ক কর্মী বলদ (দৈনিক) | পূর্ণ বয়স্ক গাভী (দৈনিক) | গর্ভবতী গাভী (দৈনিক) |
|---|---|---|---|
| কাঁচা সবুজ ঘাস | ৫-৭ কেজি | ৬-৮ কেজি | ৭-১০ কেজি |
| শুকনো খড় | ৫-৭ কেজি | ৬-৮ কেজি | ৭-১০ কেজি |
| গমের ভুসি, চালের কুঁড়া | ২-৩ কেজি | ১-১.৫ কেজি (কলাইয়ের খোসার মিশ্রণ সহ) | ১ কেজি |
| খেসারি, মাসকলাই ও ছোলার দানার মিশ্রণ | ১-২ কেজি | ১-১.৫ কেজি (ছোলা ও কলাই ভাঙা) | ১-১.৫ কেজি (খেসারি, ছোলা, মাসকলাই) |
| তিল বা তিসি বা বাদামের খৈল | ২৫০ গ্রাম | ২৫০ গ্রাম | |
| সাধারণ লবণ | ১০০-১২৫ গ্রাম | ১০০-১২৫ গ্রাম | ৭৫-১০০ গ্রাম |
| চক পাউডার | ৫০ গ্রাম | ||
| বিশুদ্ধ পানি | প্রয়োজনমতো | প্রয়োজনমতো | প্রয়োজনমতো |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: পূর্ণ বয়স্ক গাভীর ক্ষেত্রে প্রতি ১ কেজি দুধের জন্য আধা কেজি অতিরিক্ত দানাদার খাদ্য দিতে হবে ।
জাত উন্নয়নে সংকরায়ন পদ্ধতির প্রয়োগ ও সুবিধা
উন্নত খামার ব্যবস্থাপনা কৌশল
গবাদি পশুর রোগ-বালাই ও তার চিকিৎসা
প্রধান সংক্রামক রোগসমূহ
ক্ষুরা রোগ (Foot and Mouth Disease)
- লক্ষণ: এই রোগটি ভাইরাস দ্বারা সংঘটিত হয়। আক্রান্ত পশুর ১০৫-১০৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বর হয়। পশু খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয় এবং মুখ দিয়ে লালা পড়ে। পায়ের ক্ষুরে ঘা বেশি হলে চলাচল করতে পারে না। পায়ের ক্ষুরে মাছি বসে এবং ডিম পাড়ে, পরবর্তীতে কীড়া ক্ষুরে ক্ষত সৃষ্টি করে ।
- প্রতিকার: আক্রান্ত পশুকে আলো-বাতাসযুক্ত শুষ্ক ও পরিচ্ছন্ন স্থানে রাখতে হবে। পটাস-পারম্যাঙ্গানেট মিশ্রিত পানি দিয়ে দিনে অন্তত ৩-৪ বার ক্ষতস্থান ও মুখ ধুয়ে দিতে হবে। সালফানিল্যামাইড পাউডার ক্ষুরের ঘায়ে লাগালে ঘা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে। ক্ষুরের গায়ে তারপিন তেল নারকেল তেলের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করলে মাছি বসবে না। সালফামেজাথিন ৩৩.১/৩% সলিউশন বা ভেসাদিন ইনজেকশন দিলে রোগের উপশম হয়। পশুকে সবল রাখার জন্য নরম ভাত, ভাতের মাড়, ভেজানো খইল খেতে দেওয়া প্রয়োজন ।
- প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: সাধারণত টিকা প্রদান এবং আক্রান্ত পশুর থেকে সুস্থ পশুকে আলাদা রাখা এই রোগের প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ
বাদলা (Black Quarter)
- লক্ষণ: বাদলা অত্যন্ত মারাত্মক রোগ। সকল প্রকার গবাদি পশু এই রোগে আক্রান্ত হয়। এটি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ঘটে। বাছুর গরুর এই রোগ বেশি হয়। তীব্র জ্বর (১০৫-১০৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট) হয়। পশু খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। শরীরের কোনো কোনো অঙ্গ অবশ হয়ে ফুলে ওঠে। জাবর কাটা বন্ধ হয়ে যায়। পশু খুব তাড়াতাড়ি দুর্বল হয়ে যায় ও মারা যায় ।
- প্রতিকার: টেরামাইসিন ও পেনিসিলিন ইনজেকশন ভালো কাজ করে। সিরিঞ্জের সাহায্যে ব্ল্যাক কোয়াটার অ্যান্টিসেরাম পুশ করলে উপকার পাওয়া যায় ।
- প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: সুস্থ পশুকে প্রতিরোধক টিকা প্রদান করতে হবে। মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা অথবা ৪/৫ ফুট মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। চামড়া না ছাড়িয়ে পেট ফুটো করে দেওয়া প্রয়োজন ।
গো-বসন্ত (Cowpox)
- লক্ষণ: এক প্রকার ভাইরাস দ্বারা এই রোগ ঘটে। গাভীর ওলান, বাঁটের ত্বক, ষাঁড়ের শুক্র থলির ত্বক এবং অন্যান্য নরম জায়গায় প্রথম বোঝা যায়। সর্ষের দানার মতো লাল ফোস্কা দেখা যায়। পশুর মুখের খাদ্যনালীতে ঘা হয়। পাতলা পায়খানা হয়। পশুর শ্বাসকষ্ট হয়। কয়েকদিনের মধ্যে রোগাক্রান্ত পশু মারা যায় ।
- প্রতিকার: অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন ভালো কাজ করে। ক্ষতস্থানে মলম প্রয়োগে কিছুটা উপশম হয় ।
- প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: প্রতিরোধক টিকা প্রদান। পরিচ্ছন্ন জায়গায় পশুর বসবাসের ব্যবস্থা করা। বিশুদ্ধ পানি পান করানো ।
গলাফোলা রোগ (Haemorrhagic Septicemia)
- লক্ষণ: এটি একটি ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ। সকল প্রকার গবাদি পশু এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বর্ষা শেষে এই রোগের আক্রমণ বেশি হয়। স্যাঁতসেঁতে মাটিতে এই রোগের জীবাণু অতি দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে এবং সুযোগ পেলেই পশুকে আক্রমণ করে। অসুস্থ পশুর গলা ও গলকম্বল ফুলে যায়। অনেক সময় মাথাও ফুলে যায়। শরীরের তাপমাত্রা খুব বৃদ্ধি পায়। পাতলা পায়খানা করে। জাবর কাটা, দুধ দেওয়া ও বাচ্চাদের দুধ খাওয়ানো বন্ধ হয়ে যায়। চোখ দিয়ে পানি ঝরে। পশুর মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হয়। হাঁ করে শ্বাস নিতে চেষ্টা করে। আক্রমণের ২৪-৩৬ ঘণ্টার মধ্যে পশু মারা যায় ।
- প্রতিকার: অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন ও সালফার ড্রাগ ভালো কাজ করে ।
- প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: নিয়মিত টিকা প্রদান করতে হবে। আক্রান্ত পশুকে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথে আলাদা করে নিতে হবে। পশুকে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি দিতে হবে ।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও ভেটেরিনারি পরামর্শের গুরুত্ব
সারণি ৩: গবাদি পশুর প্রধান রোগবালাই: লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ
| রোগের নাম | ধরন | প্রধান লক্ষণসমূহ | প্রাথমিক প্রতিকার পদ্ধতি | গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা |
|---|---|---|---|---|
| ক্ষুরা রোগ | ভাইরাস | ১০৫-১০৭° ফা. জ্বর, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ, লালা পড়া, পায়ের ক্ষুরে ঘা, কীড়া সৃষ্টি | আক্রান্ত পশুকে পৃথকীকরণ, পটাস-পারম্যাঙ্গানেট দিয়ে মুখ ও ক্ষতস্থান ধোয়া, সালফানিল্যামাইড পাউডার/তারপিন তেল ব্যবহার, সালফামেজাথিন/ভেসাদিন ইনজেকশন, নরম খাদ্য | টিকা প্রদান, আক্রান্ত পশুকে সুস্থ পশু থেকে আলাদা রাখা |
| বাদলা | ব্যাকটেরিয়া | ১০৫-১০৭° ফা. তীব্র জ্বর, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ, শরীরের অঙ্গ ফুলে অবশ, জাবর কাটা বন্ধ, দ্রুত দুর্বল হয়ে মৃত্যু | টেরামাইসিন ও পেনিসিলিন ইনজেকশন, ব্ল্যাক কোয়াটার অ্যান্টিসেরাম পুশ | সুস্থ পশুকে টিকা প্রদান, মৃতদেহ পুড়িয়ে/পুঁতে ফেলা, পেট ফুটো করা |
| গো-বসন্ত | ভাইরাস | গাভীর ওলান/বাঁট/ষাঁড়ের শুক্র থলিতে লাল ফোস্কা, খাদ্যনালীতে ঘা, পাতলা পায়খানা, শ্বাসকষ্ট, মৃত্যু | অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন, ক্ষতস্থানে মলম প্রয়োগ | প্রতিরোধক টিকা প্রদান, পরিচ্ছন্ন বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি পান করানো |
| গলাফোলা রোগ | ব্যাকটেরিয়া | গলা ও গলকম্বল ফুলে যাওয়া, মাথা ফোলা, শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পাতলা পায়খানা, জাবর কাটা বন্ধ, চোখ দিয়ে পানি ঝরা, মারাত্মক শ্বাসকষ্ট, ২৪-৩৬ ঘণ্টায় মৃত্যু | অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন, সালফার ড্রাগ | নিয়মিত টিকা প্রদান, আক্রান্ত পশুকে দ্রুত পৃথকীকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি |
গবাদি পশু পালনে খরচ ও লাভজনকতা বিশ্লেষণ
গবাদি পশু পালনে খরচ
খামার স্থাপনের প্রাথমিক খরচ
দৈনিক খাদ্য, চিকিৎসা ও পরিচর্যা বাবদ চলমান খরচ
দুধ, মাংস ও অন্যান্য উপজাত থেকে আয়ের উৎস
লাভজনকতা বিশ্লেষণ: ছোট ও মাঝারি খামারের সম্ভাব্য আয়-ব্যয় এবং মুনাফার হার
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ
গবাদি পশুর বর্জ্য, যেমন গোবর ও গো-মূত্র, সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। গোবর কৃষি উৎপাদনের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট জৈব সার । এছাড়াও, গরুর খামারের বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বায়োগ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব । বায়োগ্যাস জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়, যা গ্রামীণ জনপদে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে । বায়োগ্যাস প্রকল্পে ব্যবহার শেষে গরুর বর্জ্য জৈব সারে রূপান্তরিত হয়, যা ভালো সার হিসেবে বিক্রি করা যায় । পটিয়া উপজেলায় অন্তত সাড়ে তিনশ’ গরুর খামারে বায়োগ্যাস প্রকল্প রয়েছে, যা গ্রামীণ জীবনচিত্র পাল্টে দিচ্ছে । এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খামারিরা আর্থিকভাবে লাভবান হন এবং পরিবেশের উপর এর নেতিবাচক প্রভাবও কমানো সম্ভব হয় ।
কৃষকদের জন্য সুযোগ, সচেতনতা ও আধুনিক প্রযুক্তি
৬.১ সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা
- প্রশিক্ষণ কার্যক্রম: বাংলাদেশ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে পশুপালন ও তার রোগবালাইয়ের চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় । প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরও খামারিদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে, যেমন ডেইরি ফার্ম ব্যবস্থাপনা, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, এবং গবাদিপশু পাখী পালনে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উঠান বৈঠকের আয়োজন ।
- কৃত্রিম প্রজনন সম্প্রসারণ: গবাদি পশুর কৃত্রিম প্রজনন দেশ ও জাতির জন্য একটি উন্নয়নমূলক আধুনিক কার্যক্রম । স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফ্রিজিয়ান ও জার্সি জাতের ১২৫টি গাভী ও ষাঁড় আমদানি করে সাভার কেন্দ্রীয় গো প্রজনন খামারে দেশী গাভীর সাথে ক্রসব্রিডিং করানো হয় 。 এর উৎসাহজনক ফলাফলের ভিত্তিতে ১৯৭৫-৭৬ সালে দেশব্যাপী কৃত্রিম প্রজনন সম্প্রসারণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক ২২টি জেলায় কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন করা হয় । বর্তমানে প্রতি উপজেলাতে পশুসম্পদ উন্নয়নে সরকার একজন করে পশুচিকিৎসক নিয়োগ করেছেন, যারা কৃত্রিম প্রজননসহ নানাবিধ পশু সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকেন । কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত ষাঁড়ের শুক্রাণু ব্যবহার করে বছরে ২ লক্ষেরও বেশি বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব । একটি ষাঁড়ের বীজ থেকে প্রতি বছর ৬০ থেকে ৮০টি গাভীর প্রজনন করানো সম্ভব, কিন্তু কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ গাভী প্রজনন করানো যায় । এটি অনেকাংশে সংক্রামক ব্যাধি রোধ করে এবং গাভী ষাঁড়ের দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয় না ।
- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সুবিধা: কৃষি ব্যাংক দুগ্ধ গাভী প্রতি ২৫,০০০/- টাকা, হালচাষ করা গরুর জন্য ২০,০০০/- টাকা এবং মহিষের জন্য ২০,০০০/- টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করে । ঋণ প্রাপ্তির জন্য আবেদনকারীকে ব্যাংকের নির্ধারিত ফরম পূরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া, এবং প্রকল্প সংক্রান্ত তথ্য (যেমন প্রজেক্ট প্রোফাইল, আর্থিক বিশ্লেষণ) প্রদান করতে হয় । যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরও প্রশিক্ষণার্থীদের মাসিক ভাতা প্রদান করে এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেয় ।
- প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের লক্ষ্য ও কার্যক্রম: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গবাদি পশু-পাখির উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিরাপদ প্রাণিজাত পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা, জেনেটিক রিসোর্স সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, এবং খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কাজ করছে । তারা দুধের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে জাত উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থা জোরদারকরণ, মাননিয়ন্ত্রণ, এবং স্কুল ফিডিং এর মাধ্যমে দুধ পানের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ।
- বেসরকারি সংস্থা ও এনজিওদের ভূমিকা: ব্র্যাক (BRAC) এর মতো বেসরকারি সংস্থা কৃত্রিম প্রজনন সেবা, কৃষক প্রশিক্ষণ, মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক, এবং টেলিহেলথ কেয়ারের মতো পরিষেবা প্রদান করে । ব্র্যাক ১৯৮৭ সাল থেকে কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচী হাতে নিয়েছে এবং বর্তমানে নিজস্ব বুল স্টেশন থেকে হিমায়িত সিমেন উৎপাদন করে মানসম্মত কৃত্রিম প্রজনন সেবা নিশ্চিত করছে । গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশনও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, মৎস্য ও কৃষি খাতে ঋণ ও ঝুঁকি মূলধন প্রদান করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখছে । প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও ‘ডেইরি ভ্যালু চেইন ফোরাম’ চালু করেছে, যার লক্ষ্য ১০,০০০ দুগ্ধ খামারিকে (যার মধ্যে ৮,০০০ নারী) তাদের সাপ্লাই চেইনে একীভূত করা এবং অতিরিক্ত ৫০,০০০ খামারিকে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা ।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার
- গবাদি পশুর বীমা পদ্ধতি: ফিনিক্স ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড গবাদি পশুর সুরক্ষায় ‘ক্যাটেল ইনস্যুরেন্স পলিসি’ চালু করেছে, যা খামারিদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে । এই বীমা পদ্ধতি খামারিদের জন্য ঋণ পাওয়া সহজ করে ।
- রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি (আরএফ) আইডেনটিফিকেশন ট্র্যাকিং সিস্টেম: এই সিস্টেমের মাধ্যমে বীমার আওতায় আসা গবাদিপশুর সঠিক স্বাস্থ্য, রোগ-বালাইয়ের তথ্য ও অবস্থান নির্ণয় করার সুবিধা থাকছে । এটি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যা ইন্টারনেট অব থিংস প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল সফটওয়্যারের মাধ্যমে গরুকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে, ফলে অসুস্থ প্রাণীর দ্রুত সুচিকিৎসাও নিশ্চিত করা সম্ভব । প্রতিটি গরুর পাকস্থলীতে একটি বায়োসেন্সর প্রবেশ করানো হয়, যা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় তথ্য সংগ্রহ করে এবং অন্তত পাঁচ বছর কার্যকর থাকে ।
- ডিজিটাল রেকর্ড কিপিং ও মোবাইল অ্যাপের ব্যবহার: আদর্শ প্রাণিসেবা’র মতো প্ল্যাটফর্ম মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গবাদি প্রাণীর রেজিস্ট্রি ও বংশের তথ্য, গর্ভাবস্থা ও প্রজনন সম্পর্কিত তথ্য, স্বাস্থ্য, টিকা ও খামার পরিচালনা সংক্রান্ত তথ্য, খাদ্য গ্রহণ সংক্রান্ত তথ্য ও ওজন পরিমাপ সংরক্ষণ করার সুবিধা প্রদান করে । এটি সময়মত গাভীর হিট নির্ণয় এবং সঠিক সময়ে বীজ ভরন সংক্রান্ত তথ্য প্রেরণ করে, পাশাপাশি এসএমএস-এর মাধ্যমে আগাম বাছুর হওয়া ও অন্যান্য সতর্কতাবার্তা প্রেরণ করে । এছাড়াও, এটি গবাদি প্রাণীর সার্বক্ষণিক শারীরিক তাপমাত্রা, সুস্থতা পর্যবেক্ষণ ও অসুস্থতা সংক্রান্ত সতর্কতাবার্তা প্রেরণ করে । প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর একটি অ্যাপের সূচনা করেছেন, যার মাধ্যমে গবাদি পশুপালকরা গরু-মহিষের প্রজনন বা গর্ভধারণ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য, উপযুক্ত খাদ্য ও চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্য পেতে পারেন ।
- টেলিমেডিসিন সেবা: ব্র্যাকের মতো সংস্থাগুলো গবাদি পশুর স্বাস্থ্য সেবার জন্য টেলিমেডিসিন পরিষেবা প্রদান করে, যা কৃষকদের জন্য দ্রুত এবং সহজলভ্য ভেটেরিনারি পরামর্শ নিশ্চিত করে ।
সচেতনতা বৃদ্ধি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
- সুষম খাদ্য ও ঘাস চাষের গুরুত্ব: কৃষকদের মধ্যে সুষম খাদ্যের গুরুত্ব এবং কাঁচা ঘাস চাষের সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাস সরবরাহ করলে খাদ্য খরচ কমে, পশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে, এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ।
- রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যবিধিতে কৃষকদের ভূমিকা: রোগবালাই দমনে কৃষকদের নিয়মিত টিকা প্রদান, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, এবং অসুস্থ পশুকে দ্রুত পৃথক করার বিষয়ে সচেতন করা অপরিহার্য ।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব: গবাদি পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা সম্পর্কে কৃষকদের অবহিত করা উচিত ।
- খামার পরিচালনায় সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলায় করণীয়: খামার পরিচালনায় বড় বিনিয়োগ, রোগের ঝুঁকি, এবং দ্রুত লাভের অভাবের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয় । এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা কৌশল, এবং সরকারি-বেসরকারি সহায়তার সদ্ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহার ও সুপারিশমালা
সফল ও টেকসই গবাদি পশু খামার পরিচালনার জন্য মূল বিষয়সমূহ
- সঠিক জাত নির্বাচন: খামারের উদ্দেশ্য (দুধ বা মাংস) এবং স্থানীয় পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নত বা সংকর জাত নির্বাচন করা লাভজনকতার প্রথম ধাপ। হলষ্টাইন ফ্রিজিয়ান ও জার্সি দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য, এবং হরিয়ানা, লাল সিন্ধী, শাহীওয়াল মাংস ও শ্রমের জন্য উপযোগী। ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট মাংসের জন্য এবং যমুনাপারী দুধের জন্য ছোট খামারিদের জন্য বিশেষ উপযোগী।
- আধুনিক বাসস্থান ও পরিচর্যা: উঁচু ও ঢালু মেঝেযুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা, এবং পরিচ্ছন্ন খাবার পাত্র রোগমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে। ামার তৈরিতে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো উচিত, শুধু ছাউনিই যথেষ্ট।
- সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা: পশুর বয়স ও উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী সুষম খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা জরুরি। দানাদার খাদ্যের উপর নির্ভরতা কমিয়ে কাঁচা ঘাস চাষ ও সাইলেজ তৈরির মাধ্যমে খাদ্য খরচ কমানো সম্ভব, যা উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে এবং পশুর স্বাস্থ্য উন্নত করে।
- রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা: উন্নত জাতের পশু রোগপ্রবণ হওয়ায় নিয়মিত টিকা প্রদান, অসুস্থ পশুকে পৃথকীকরণ, এবং খামারে জীব-নিরাপত্তা কঠোরভাবে অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক। রোগ দেখা দিলে দ্রুত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- আর্থিক পরিকল্পনা: খামার স্থাপনের প্রাথমিক খরচ ও চলমান খরচ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। দুধ ও মাংসের পাশাপাশি গোবর থেকে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, যা খামারের সামগ্রিক লাভজনকতা বৃদ্ধি করে।
- প্রযুক্তি ও সহায়তা গ্রহণ: কৃত্রিম প্রজনন, গবাদি পশুর বীমা, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ট্র্যাকিং সিস্টেম, ডিজিটাল রেকর্ড কিপিং এবং টেলিমেডিসিন সেবার মতো আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করা উচিত। সরকারি সংস্থা (যেমন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর) এবং বেসরকারি সংস্থা (যেমন ব্র্যাক, প্রাণ-আরএফএল) প্রদত্ত প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা, ও কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করে খামারিরা নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পারেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং কৃষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ
- প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান অর্জন: আধুনিক পালন পদ্ধতি, রোগ ব্যবস্থাপনা, এবং আর্থিক পরিকল্পনা সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা।
- প্রযুক্তির ব্যবহার: খামারের আকার ও সামর্থ্য অনুযায়ী ডিজিটাল প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি করা, যা উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়াবে।
- টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: গোবর থেকে বায়োগ্যাস ও জৈব সার উৎপাদন করে পরিবেশগত সুবিধা এবং অতিরিক্ত আর্থিক লাভ অর্জন করা।
- সহযোগিতা ও নেটওয়ার্কিং: স্থানীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তর, এনজিও, এবং অন্যান্য খামারিদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, যা তথ্য আদান-প্রদান ও সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।
- বাজার বিশ্লেষণ: বাজারের চাহিদা ও প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন থাকা, যাতে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পাওয়া যায়।